এইডসঃ লজ্জার চেয়ে বাঁচা জরুরী (পর্ব-২)

আগের পর্বে এইডসের বিভিন্ন পরিসংখ্যান নিয়ে কথা বলেছি। চলুন এবার দেখে নেই কি আসলে এই এইডস।

এইডস (AIDS) আসলে কি?

এইডস হলো আইআইভি ভাইরাসের সংক্রমনের একটা পর্যায় যেখানে মানুষের দেহের সাধারন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় এবং যেকোনো ভাইরাস খুব সহজেই রোগীকে আক্রান্ত করতে পারে। এইচআইভি ভাইরাসের সংক্রমন হলে এইডস প্রায় নিশ্চিত। কখনো কখনো এই ভাইরাস প্রায় ১০-১৫ বছর মানবদেহে সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। যার কারনে ভাইরাসে আক্রান্ত কেউ কেউ অনেকদিন পর্যন্ত জানতেই পারেনা যে কি প্রাণঘাতী জীবানু সে দেহে বহন করছে। মূলত এইডস একটি রোগ নয়, এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অভাব জনিত নানা রোগের সমাহার। এইডস রোগীর দেহে এমন অবস্থা সৃষ্টি করে যেখান থেকে রোগী সামাণ্য সর্দি বা জ্বরের জীবানুকেও প্রতিরোধ করতে পারে না। অর্থাৎ জীবানুদের আতুরঘরে পরিনত হয় রোগীর দেহ।

এইচআইভি (HIV) ভাইরাসঃ

AIDS

এইচআইভি ভাইরাস একটি আরএনএ(RNA) ভাইরাস। যা লেন্টিভাইরাস গোত্রের অন্তর্গত এবং এই ভাইরাসের সংক্রমন এইডস  রোগের কারণ। ভাইরাসটি প্রধানত মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রধান কোষগুলো যেমন সাহায্যকারী টি কোষ, ম্যাক্রোফেজ এবং ডেনড্রাইটিক কোষগুলোকে আক্রমণ করে।  এইচ.আই.ভি দ্বারা আক্রান্ত এবং চিকিৎসা না হওয়া বেশীরভাগ মানুষ এইডস রোগের স্বীকার হয় এবং তাদের বেশীরভাগ মারা যায় সুযোগসন্ধানী সংক্রোমন অথবা ম্যালিগন্যানসির যা ক্রমশ কমতে থাকা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ফলাফল। এইচ.আই.ভি সংক্রোমন থেকে এইডস হওয়ার হার নির্ভর করে ভাইরাস, পোষক এবং পরিবেশ প্রভৃতি প্রভাবকের উপর। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সাধারনত এইচ.আই.ভি সংক্রোমন থেকে এইডস হতে ১০ বছর সময় লাগে তবে কোন কোন ক্ষেত্রে এর চেয়ে কম না বেশী সময় লাগতে পারে।

এইডসের কারনঃ

এইডসের প্রধান ও একমাত্র কারনই এইচআইভি ভাইরাসের সংক্রমণ। এই ভাইরাসটি মানবদেহে চারটি তরল পদার্থের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে প্রবেশ করতে পারে। এরা হলো- রক্ত, বীর্য, দুধ এবং লসিকা। এই ভাইরাস মানব দেহে ছড়ানোর প্রধান উপায়গুলো হলো-

  • এইচ.আই.ভি. তে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ করলে, বা তার ব্যবহৃত ইনজেকশনের সিরিঞ্জ বা সূঁচ ব্যবহার করলে।
  •  আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো অঙ্গ অন্য ব্যক্তির দেহে প্রতিস্থাপন করলে।
  • এইচ.আই.ভি. তে আক্রান্ত গর্ভবতী মায়ের শিশুরও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
  • এইচ.আই.ভি. তে আক্রান্ত কারো সাথে অসংরক্ষিত  যৌন সম্পর্ক করলে।

অর্থাৎ কোনোভাবে এইডস আক্রান্ত ব্যক্তির এই চারটি তরলের সংস্পর্শে এলেই এইডসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা আসে।

কিছু লক্ষণঃ

এইডস যেহেতু আলাদা কোনো রোগ না তাই এর আলাদা তেমন কোনো লক্ষণ নেই। তবুও প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু উপসর্গ দেখা যায় যেগুলোকে এইডসের লক্ষণ বলে চিহ্নিত করা যায়। যেমন-

  • প্রথমত জ্বর ও দূর্বলতা। 
  • বুকে বা পিঠে লালচে দানা। 
  • গলার লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া।
  •  মাথা ব্যথা, মাংসপেশী ব্যথা, অক্ষিকোটরের পেছনে ব্যথা, গাঁটে গাঁটে ব্যথা অনুভব হওয়া।
  • কিছু কিছু ক্ষেত্রে যৌনাঙ্গে ঘা দেখা যায়। এছাড়া আরো কিছু কিছু উপর্সগ দেখা যায়।

যেহেতু এইডস আক্রান্তের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় সুতরাং তাকে যেকোনো জীবানুই আক্রান্ত করতে পারে। তাই যেকোনো রোগেরই উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

 

চিকিৎসা ও প্রতিকারঃ

বর্তমানে হার্ট (HAART) নামক একটি চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে এইডসের চিকিৎসা করা হয়। যেখানে বিভিন্ন এন্টি রিট্রোভাইরাল এজেন্ট ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ক্লাসের ওষুধের মধ্য থেকে ন্যূনতম দুইটি ক্লাসের ওষুধ একটি নির্দিষ্ট কম্বিনেশনের মাধ্যমে প্রদান করা হয়। ক্লাসগুলো হলো –

  • Non-nucleoside reverse transcriptase inhibitor (NNRTI)
  • Nucleoside analog reverse transcriptase inhibitors (NRTIs)
  • Zidovudine (AZT) Tenofovir (TDF)
  • Lamivudine (3TC) or Emtricitabine (FTC)
  • Protease inhibitors (PI)

এইসব ওষুধ গ্রুপের মাধ্যমে এইডস সারানো যায় না। কেবল মাত্র তার কার্যকারিতা কমানো যায়।

প্রতিরোধঃ

যেহেতু এইডসের এখনো কোনো কার্যকর ওষুধই আবিষ্কৃত হয়নি সুতরাং এটির জন্য প্রতিরোধই সর্বোত্তম উপায়। এইডস প্রতিরোধের জন্য আমাদের সচেতনতাই সবচেয়ে বেশী দরকার। কিছু কিছু সাধারন বিষয়ে সতর্ক থাকলেই এইডসের ঝুকি সম্পূর্নরূপে এড়ানো যায়। যেমন –

  • অন্যের রক্ত গ্রহণ বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনে আগে রক্তে এইচআইভি আছে কিনা পরীক্ষা করে নেয়া।
  • ইনজেকশন নেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবারই নতুন সুচ/সিরিঞ্জ ব্যবহার করা।
  • অনিরাপদ যৌন আচরণ থেকে বিরত থাকা।
  • এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত মায়ের সন্তান গ্রহণ বা সন্তানকে বুকের দুধ দেয়ার ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া।
  • কোন যৌন রোগ থাকলে বিলম্ব না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া।

 

পরিশেষে শুধু এইটুকুই বলা যায়, আমাদের সাধারন কিছু সচেতনতায় বেচে যাবে আমাদের জীবন। চলুন এই বিষয়ে নিজে সচেতন হই, নিজের আপনজনদের সচেতন করি। অনেক তো হলো লজ্জা পাওয়া, এবার নিজের জীবনটাও বাঁচাই।

 

Contributor: Zobair Hossain Mahfuz

Institution of Education and Research

University of Dhaka

আরও গল্প

একটা মুভি দেখা কি এতই ...

এই কি জীবনের সব?

কেন আমি কখনো বৃষ্টিতে ভিজতে ...

আরও গল্প

মধুর উপকারিতা

হেলথকেয়ার ব্লগ
3 weeks ago

স্বাস্থ্য রক্ষায় রসুন

হেলথকেয়ার ব্লগ
3 weeks ago

১০০ রোগের ঔষধ একটি নিম গাছ

হেলথকেয়ার ব্লগ
1 month ago