থ্যালাসেমিয়াঃ প্রতিষেধক নয়, দরকার প্রতিরোধ।

থ্যালাসেমিয়া কি?

থ্যালাসেমিয়া হলো রক্তস্বল্পতা জনিত মারাত্মক বংশগত রোগ। এই রোগে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী হিমোগ্লোবিন কণার উৎপাদনে ত্রুটি হয়। থ্যালাসেমিয়া ধারণকারী মানুষ সাধারণত রক্তে অক্সিজেনস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়াতে ভুগে থাকেন। অ্যানিমিয়ার ফলে অবসাদ থেকে মারাত্মক অঙ্গহানি পর্যন্ত ঘটতে পারে। তাছাড়া থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীর প্রতিমাসে এক বা একাধিক রক্ত সঞ্চালন করতে হয়। ঘন ঘন রক্ত পরিসঞ্চালনের ফলে রোগীর দেহে অতিরিক্ত আয়রন জমা হয়। বাড়তি এই আয়রন প্রয়োজনীয় ওষুধের মাধ্যমে বের করা না হলে রোগীর মৃত্যুও ঘটতে পারে।

এটি বংশগত রোগ হবার কারনে এর বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে বেড়ে চলেছে। অধিকাংশসময় বাবা-মা বুঝতেই পারেননা তার আদরের সন্তানটি কেন এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এক গবেষণার জরিপ অনুযায়ি বাংলাদেশের শতকরা ১০-১২ভাগ মানুষ এই রোগের বাহক। সেই হিসেবে প্রায় ১.৫ কোটি লোক বহন করে চলছে এর প্রাণঘাতী রোগ। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৯০হাজার শিশু এই রোগে ভুগছে এবং প্রতিবছর এই রোগ নিয়ে জন্ম নিচ্ছে প্রায় ১৪-১৫ হাজার শিশু।

থ্যালাসেমিয়ার ধরনঃ

থ্যালাসেমিয়া প্রধানত দুই ধরনের। আলফা থ্যালাসেমিয়া এবং বেটা থ্যালাসেমিয়া। সাধারণভাবে আলফা থ্যালাসেমিয়া বেটা থ্যালাসেমিয়া থেকে কম তীব্র। আলফা থ্যালাসেমিয়াবিশিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে রোগের উপসর্গ মৃদু বা মাঝারি প্রকৃতির হয়। অন্যদিকে বেটা থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে রোগের তীব্রতা বা প্রকোপ অনেক বেশি; এক-দুই বছরের শিশুর ক্ষেত্রে ঠিকমত চিকিৎসা না করলে এটি শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

বিশ্বে বেটা থ্যালাসেমিয়ার চেয়ে আলফা থ্যালাসেমিয়ার প্রাদুর্ভাব বেশি। আলফা থ্যালাসেমিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের সর্বত্র এবং কখনও কখনও ভূমধ্যসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের লোকদের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়।

রোগের কারনঃ

ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন জিনের কারণে থ্যালাসেমিয়া হয়। বাবা অথবা মা, অথবা বাবা- মা উভয়েরই থ্যালাসেমিয়া জীন থাকলে বংশানুক্রমে এটি সন্তানের মাঝে ছড়ায়। এক গবেষণায় দেখা যায়,বাবা এবং মা উভয়ের থ্যালাসেমিয়া জীন থাকলে ভূমিষ্ট শিশুর শতকরা ২৫ ভাগ থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হয়।

এই রোগের জন্য ক্রোমোজোমে উপস্থিত জিনের mutation বা deletion দায়ী। চারটি জিন দিয়ে থ্যালাসেমিয়া শিকল তৈরি হয়। বাবা-মা থেকে প্রাপ্ত চারটি জিনের মধ্যে এক বা তার অধিক ত্রুটিপূর্ণ হলে আলফা থ্যালাসেমিয়া হয়। যত বেশি জিন ত্রুটিপূর্ণ হবে তত বেশি মারাত্মক সমস্যা দেখা দিবে। যদি একটি জিন আক্রান্ত হয় তবে রোগ দেখা দিবে না তবে শিশু বাহক হিসেবে কাজ করবে। দুইটি জিন আক্রান্ত হলে অল্প উপসর্গ দেখা যাবে। এই অবস্থাকে বলে থ্যালাসেমিয়া মাইনর। তিনটি জিন আক্রান্ত হলে সমস্যা প্রকট হয় এবং মারাত্মক উপসর্গ দেখা যাবে। আর যদি চারটি জিনই ক্ষতিগ্রস্থ হয় তবে এটিকে বলা হয় থ্যালাসেমিয়া মেজর।  এটি এই রোগের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অবস্থা।

রোগের লক্ষণ বা উপসর্গঃ

এই রোগের উপসর্গ শিশুর জন্মের ৩-১৮ মাসের মধ্যে শুরু হয়। এর বিভিন্ন উপসর্গ রয়েছে। যেমন-

  • দেহে অতিরিক্ত সংক্রমণ।
  • অস্বাভাবিক অস্থির আকার/আকৃতি।
  • প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া।
  • অবসাদ অনুভব।
  • শ্বাসকষ্ট।
  • মুখ-মন্ডল ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া।
  • ত্বক হলদে হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)।
  • ধীরগতিতে শারীরিক বৃদ্ধি।
  • পেট বাইরের দিকে প্রসারিত হওয়া বা বৃদ্ধি পাওয।
  • গাঢ় রঙের প্রস্রাব।
  • হৃৎপিণ্ডে সমস্যা ইত্যাদি।

থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসাঃ

বর্তমানে থ্যালাসেমিয়ার বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদী এবং স্থায়ী চিকিৎসা রয়েছে। স্বল্পমেয়াদী চিকিৎসার মাঝে রয়েছে-

  • নিয়মিত নিরাপদ রক্তের লোহিতকণিকা (RBC) পরিসঞ্চালন।
  • নিয়মিত লৌহ অপসারঙ্কারী ঔষধ ব্যবহার।
  • নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ।
  • নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ।

এছাড়াও কিছু স্থায়ী চিকিৎসা রয়েছে যার মাধ্যমে সম্পূর্ণরুপে থ্যালাসেমিয়া নিরাময় করা যায়। যদিও এগুলো অত্যন্ত ব্যায়বহুল চিকিৎসা। যেমন-

  • অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপন (Bone marrow transplantation)
  • সর্বাধুনিক স্টেম সেল থেরাপি (Stem cell therapy)

প্রতিরোধঃ

কথায় আছে Prevention is better than cure. কথাটি থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী প্রযোজ্য। একটি বিশেষ রক্তপরীক্ষা (HB Electrophoresis) এর মাধ্যমে জেনে নেয়া সম্ভব কেউ এই রোগের বাহক কিনা। একজন বাহকের সাথে সুস্থ্য মানুষের বিবাহে এই রোগ পরবর্তী প্রজন্মে আসে না। সুতরাং দুইজন বাহকের বিবাহবন্ধন থেকে বিরত থাকা উচিত। এছাড়াও আগেই বাহক হিসেবে জেনে গেলে জেনেটিক কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে আক্রান্ত জিনটি শিশুদেহে প্রবেশ থেকে আটকানো যায়, ফলে শিশুতে এই রোগটি আর হয়না।

পরিশিষ্ট:

৮ মে, বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়। আমাদের এখানে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি ও হাসপাতাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান থ্যলাসেমিয়া আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করে থাকে। যেকোনো প্রয়োজনে তাদের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। থ্যালাসেমিয়ার স্থায়ী চিকিৎসা অনেক ব্যায়বহুল হওয়ায় এটি করানো সবার পক্ষে সম্ভব হয়না ফলে অনেকেই লোহিত রক্তকণিকার সঞ্চালন করিয়ে থাকেন। একারনে প্রতিমাসে প্রচুর রক্তের প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে আমরা যারা সুস্থ আছি, আমাদের সকলের উচিত এমন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত কাউকে নিয়মিত রক্ত দান করা এবং তাদের পাশে থাকা।

 

Contributor: Zobair Hossain Mahfuz

Institute of Education and Research (IER)

University of Dhaka

আরও গল্প

একটা মুভি দেখা কি এতই ...

এই কি জীবনের সব?

কেন আমি কখনো বৃষ্টিতে ভিজতে ...

আরও গল্প

মধুর উপকারিতা

হেলথকেয়ার ব্লগ
3 weeks ago

স্বাস্থ্য রক্ষায় রসুন

হেলথকেয়ার ব্লগ
3 weeks ago

১০০ রোগের ঔষধ একটি নিম গাছ

হেলথকেয়ার ব্লগ
1 month ago